

মঙ্গলবার ● ১২ এপ্রিল ২০১৬
প্রথম পাতা » উপ-সম্পাদকীয় » চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব
চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব
প্রকাশ ঘোষ বিধান
বাংলা বছরের চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন হিসেবে পুরাতনকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ করার জন্য প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন। আবহমান বাংলার চিরায়িত বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আসছে এই চৈত্র সংক্রান্তি।
হিন্দুশাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যময় বলে মনে করা হয়। সংক্রান্তির দিন শিবের গাজন বা চড়কপূজা আর তার আগের দিন নীলপূজা। চৈত্রসংক্রান্তির দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শাস্ত্র মেনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস করে থাকেন। শিবের গাজন ও ধর্মের গাজন নামে পালাগানও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। গাজন মূলত কৃষকদের উৎসব। চৈত্রের দাবদাহ থেকে রক্ষা পেতে বৃষ্টির জন্য চাষীরা পালার আয়োজন করে থাকে যা গাজন নামে পরিচিত। নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন।
ঋতু বৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর শেষ ঋতু বসন্তকাল। পত্র পুষ্পে নতুন পল্লবে সজ্জিত হয়ে বৃক্ষরাজী নতুন রূপ ধারন করে। চৈত্র মাস হলো বছরের শেষ মাস। নববর্ষের প্রারম্ভিক ধর্মকার্য বিষুবকৃত্য। পূর্বদিনের সংক্রান্তির নাম মহাবিষুব সংক্রান্তি। বিষুবকৃত্যে শক্তুদান, জলদান, ফলদান, অন্নদান ইত্যাদি পূর্ণ কর্মরুপে বিবেচিত হয়। আর্য়ুবেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে শরৎ গ্রীস্মে, শীত গ্রীস্মকালে পিত্ত প্রকোপিত হয়। তাই বসন্তরোগের প্রার্দুভাব ঘটে। শুক্তো ও নিমপাতা পিত্ত প্রকোপ নাশ করে। বিষুব সংক্রান্তির পরে নববর্ষ শুরু হয়।
চৈত্র সংক্রান্তি শেষ দিনে শুরু হয় চৈত্র সংক্রন্তির শুভ আয়োজন। বাংলাদেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠিত হয় শিব-কালীর পূজা। কোন অঞ্চলে চড়ক পূজা, কোন অঞ্চলে ক্ষেত্রপাল পূজা। কারণ চৈত্র সংক্রান্তির পূর্ণ লগ্নে শিব ও কালীর মিলন হয় বলে বৃহত্তর আঙ্গীকে পূজার আয়োজনে ব্যস্ত থাকে ভক্তবৃন্দরা। এটিকে কোন এলাকায় ক্ষেত্রপাল পূজা বলে। ক্ষেত্রপাল অর্থ হলো ক্ষেত্রের অধিপতি ও সৃষ্টির অধিপতি বা মঙ্গলের ধারক ও বাহক। তাই শিবের এক নাম মঙ্গলেশ্বর। তাই বলা হয় যত্র জীব তত্র শিব। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানে শিব। এই পৃথিবী ক্ষেত্র বা প্রকৃতি রূপে কালী আর ক্ষেত্রের অধিপতি শিব। এখানে চড়ক পূজা হলো শিব ও কালীর প্রতীক। চড়ক পূজার গাছটি হলো শিবের প্রতীক, আর ঘুরানো চড়ক হলো কালীর প্রতীক। শিব আর কালীর মিলন স্বরুপ হলো কালী পূজা।
চড়ক পূজা উপলক্ষ্যে ৭, ৯ , ১৫ দিন আগে বিভিন্ন এলাকার পূজারীদের মধ্যে ২০-৩০ জন সন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাড়ী বাড়ী গিয়ে শিব-গৌরী নিত্যগীতি সহকারে মাগন করে। চড়ক পূজা পর্যন্ত তারা পবিত্রতার সাথে সন্যাস ব্রত পালন করে এবং নিরামিশ খাদ্য ভক্ষন করে। সারাদিন উপবাস পালন করে। পূজার ২ দিন আগ থেকে পুজারীরা শ্মশানে গিয়ে পূজা অর্চনা করেন ও শেষে গৌরির বিয়ে, গৌরি নাচ ও বিভিন্ন ধর্মীয় পালাগান গেয়ে ঢাক, ঢোল বাজনা সরগম করে গোটা এলাকা প্রদিক্ষন করে। ছেলেরা গৌরি সাজে, ঘুঙুর পরে নিত্য করে। চৈত্র মাসের শেষ দিন সন্যাসীরা পূজা করে পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রন জানায়। বালিচ্ছেদ দিয়ে নৃত্য, শিবের নৃত্য, কালীর নৃত্য দেখানো হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়ক গাছ ঘুরানো হয়। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন সন্যাসীরা খেঁজুর গাছে উঠে খেঁজুর নৃত্য করে এবং দর্শকদের মধ্যে খেঁজুর ছিটিয়ে দেয়। তিনদিন ধরে অনুষ্ঠিত পূজার চৈত্র মাসের শেষ দিন পূজা শেষে অগ্নীনৃত্যের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠিকতা শেষ হয়।
কথিত আছে, বাংলা পঞ্জিকার চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়েছিল তিক্রা নক্ষত্র হতে। পুরাণে আছে, সাতাশটি নক্ষত্রের নামে দক্ষ রাজ সুন্দরী কন্যাদের নামকরণ করেছিলেন। তার দু’কন্যার নাম যথাক্রমে চিত্রা ও বিশাখা। এক মাস ব্যবধানে জন্ম বলে এই দুই কন্যার নাম থেকে জন্ম নিল বাংলা দুই মাস; যথাক্রমে চৈত্র ও বৈশাখ। চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু। বাঙালির সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব পালিত হয় এই দুই দিনে। চিত্রার নাম অনুসারে এক নক্ষত্রের নাম করা হয় চিত্রা নক্ষত্র এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরা হয়। তাই হিন্দু ধর্মে চৈত্র মাসের বিশেষ স্থান। প্রাচীন কাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে চড়ক পুজা ও মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থানে চৈত্র মাসের শেষ দিন চড়ক পূজার মেলা অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির শুভ দিনে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী সুখী হোক এবং মহাবিশ্ব শান্তিধামে পরিণত হোক। স্বার্থক হোক মহাবিষুর সংক্রান্তি।
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণে বৈশাখি উৎসব, তার বয়স খুব বেশি দিনের নয়। চৈত্র সংক্রান্তিই ছিল প্রধান উৎসব। বর্ষশেষের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব পালনেই বাঙালি অভ্যস্ত ছিল দীর্ঘ কাল। বছরের শেষ দিন হিসেবে পুরাতনকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ করার জন্য প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন। আবহমান বাংলার চিরায়িত বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আসছে এই চৈত্র সংক্রান্তি।
চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু। বাঙালির সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব পালিত হয় এই দুই দিনে। এই দুই উৎসবের মধ্যে চৈত্র সংক্রান্তির পাল্লা ভারী। বাংলা বর্ষের সর্বাধিক উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি। মনে করা হয়, চৈত্র সংক্রান্তিকে অনুসরণ করেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এত আয়োজন। তাই চৈত্র সংক্রান্তি হচ্ছে বাঙালির আরেক বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। একসময় বাংলায় প্রতিটি ঋতুরই সংক্রান্তির দিনটি উৎসবের আমেজে পালন করতো বাঙালি। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সে উৎসব। তবে আজো বাঙালি আগলে রেখেছে সংক্রান্তির দুটি উৎসবকে। একটি পৌষ সংক্রান্তি অপরটি চৈত্র সংক্রান্তি।
কখনো ধর্মীয় বিশ্বাস, কখনো আবহমান বাংলার ঐতিহ্য আর লোক উৎসব হিসেবে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে বাঙালি কিংবা বাংলার মানুষ এই দিনকে কেন্দ্র করে উৎসব পালন করে। চৈত্র সংক্রান্তির মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে সফলতা ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় নতুন বছরে দেখা দেবে নতুন ভোর পহেলা বৈশাখ। পুরনো বছরের সব জরাজীর্ণতা মুছে ফেলে বাঙালি মিলিত হবে পহেলা বৈশাখের সর্বজনীন উৎসবে।
লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট