

বুধবার ● ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পাখি বাসা বাঁধতে গাছে মাটির পাত্র
পাখি বাসা বাঁধতে গাছে মাটির পাত্র
জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পাখি। পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিবেশবাদী সংগঠণ বনবিবি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় তৈরিতে গাছে গাছে কৃত্রিম বাসা স্থাপনের এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেছে। পাখি প্রজাতির প্রজননের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে গাছে মাটির পাত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ লাগানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাখি প্রজাতির বাসা বাঁধার সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রজনন সফলতা করার লক্ষ্য এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
আমাদের দেশে বড় বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিরা বাসা বাঁধার স্থান পাচ্ছে না। বড় বড় গাছ না থাকায় ও বাসা তৈরির পরিবেশ না পাওয়ায় ডিম পাড়ার সময় পাখিরা দিশেহারা হয়ে যায়। তাই পাখি প্রজাতির প্রজননের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে মাটির হাঁড়ি লাগানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দেশীয় পাখির বংশ বিস্তার এবং আগের মতো পাখির কলরব ফিরিয়ে আনতে গাছে গাছে পাখিদের কৃত্রিম আবাসস্থল গড়ে দেওয়ার এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশীয় পাখি রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশবাদি সংগঠণ বনবিবি। পাখির জন্য নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণে গাছে গাছে বেঁধে দিয়েছেন মাটির হাঁড়ি ও কলস। পাখিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম বাসা।
শিল্পায়নের এ যুগে আধুনিকতার নামে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে বন-জঙ্গল ও পাখির আবাসস্থল। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাখির বংশ বৃদ্ধি। হুমকির মুখে জীববৈচিত্র ও পরিবেশের ভারসাম্য। আর তাইতো পাখির বংশ বৃদ্ধিসহ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে কাজ করছে দেশের কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন। ২০১৬ সাল থেকে বনবিবি সংগঠণটি পাখিদের অভয়াশ্রম গড়তে উপকূলের পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছে গাছে মাটির হাঁড়ি, কলস, কাঠের বাস্ক, ঝুড়ি ও বাঁশের তৈরি বাসা বেধে দিয়েছে। শুধু পাইকগাছা নয় পাশের উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছে গাছে মাটির হাঁড়ি বেধে দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ অভয়াশ্রমে কৃত্রিম বাসায় পাখিরা নিজের মতন করে বাসা বেধে ডিম পাড়ছে, বাচ্চা ফুটিয়ে লালন পালন করছে। বাচ্চা উড়ার মত হলে বাসা থেকে বাচ্চা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বাসায় পাখিদের বাসা তৈরি করা ও বিচরণ মুখরিত করে।
পাখিরা বাসায় বাস করে না। তারা ডিম পাড়া, ডিম ফোটানো এবং বাচ্চাদের লালন পালন করার জন্য নিরাপদ জায়গায় বাসা তৈরি করে। পাখির প্রজননের সময় নির্দিষ্ট জায়গার দরকার, যেখানে পাখি বাসা তৈরি করতে পারে। বৈশাখ মাস থেকে দেশি পাখি বিশেষ করে ঝুঁটি শালিক, ভাত শালিক, দোয়েল, কুটুরে প্যাঁচা, কাঠ শালিক, চড়ুই পাখিরা প্রজনন ঘটায়। এই সময় পাখিদের বাসা বাঁধার জন্য নির্দিষ্ট জায়গার প্রয়োজন হয়। সেগুলোর মধ্যে বড়বড় গাছের কোটর, নারকেল গাছের ফোকরসহ পুরোনো দালানের ভাঙা ভেন্টিলেটর ইত্যাদি। দেশের আবাসিক পাখিদের বসবাস ও প্রজননের জন্য যে আবাস প্রয়োজন তা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। যেহেতু এসব জায়গা বর্তমানে অপ্রতুল হয়ে উঠেছে, তাই প্রয়োজনের তাগিদে দরকার পড়ছে কৃত্রিম বাসার।
পাখিদের অবাধ বিচরণ, নিরাপদ আশ্রয় তৈরি ও বংশবৃদ্ধির জন্য গাছে গাছে বসানো হয়েছে মাটির পাত্র, কাঠ-টিনের তৈরি বাসা ও বাঁশের তৈরি বাসা। এতে ঝড়, বৃষ্টি, রোদ থেকেও বাঁচবে পাখিরা। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়, রক্ষা ও তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য উঁচু গাছগুলোতে কৃত্রিম বাসার হাঁড়িগুলোতে ছোট ছোট ছিদ্র করে দেওয়া হয়েছে। এতে বৃষ্টির পানি ঢুকলেও নিচের ছিদ্রগুলো দিয়ে পড়ে যাবে। তাছাড়া মাটির পাত্ররে দুই দিকে বড় দুটি মুখ রাখা হয়েছে। ফলে হাঁড়ির মধ্যে ঢুকতে ও বের হতে পাখিদের কোনো সমস্যা হয় না। নিরাপদ আশ্রয় হাঁড়িগুলোতে বাসা বেঁধে পাখিরা বংশ বিস্তার করতে পারবে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে দারুণভাবে জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে গেছে, আবহাওয়ায় এসেছে পরিবর্তন। বিভিন্ন মৌসুমী বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ঘটেছে। অসময়ে অতিবৃষ্টি, খরা ও ঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বে প্রায় ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। প্রতিটি প্রজাতির পাখির আকার, আয়তন, রং ও ডাকের ধ্বনি অন্যান্য প্রজাতি থেকে আলাদা। এই ভিন্নতার কারণে পাখিদের এত রূপ। পাখির উড়ালকৌশল এক অবাক বিষ্ময়। পাখি হলো উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট মেরুদণ্ডী প্রাণী যাদের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো, পালকাবৃত দেহ, দাঁতবিহীন বাঁকা চোয়াল, কঠিন খোলসে আবৃত ডিম পাড়া, একটি উচ্চ বিপাকীয় হার, একটি বিভক্ত হৃৎপিণ্ড এবং একটি শক্তিশালী হালকা ওজনের ফাঁপা কঙ্কাল।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে দারুণভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে জলবায়ু, আবহাওয়ায় এসেছে পরিবর্তন। বিভিন্ন মৌসুমী বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ঘটেছে। অসময়ে অতিবৃষ্টি, খরা ও ঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন পাখির উপর প্রভাব ফেলেছে। পাখির প্রধান প্রজনন মৌসুম ফেব্রুয়ারি - জুন পর্যন্ত। এ সময়ে অতি বৃষ্টি ও ঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে পাখিদের বাসা বাঁধা, ডিমের সুরক্ষা ও সংখ্যা বৃদ্ধির কার্যক্রম। তাই অনেক সাধারণ পাখি প্রজননের সুযোগ না পেয়ে বংশ হ্রাসের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অথচ পাখিদের প্রজাতি বৈচিত্র ও সংখ্যার সাম্যাবস্থা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই পাখি সংরক্ষণে পরিবর্তিত পরিবেশে বাসা বাঁধার সুযোগ সৃষ্টি করে সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ খুবই দরকার।