

শনিবার ● ১৫ মার্চ ২০২৫
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির গুরুত্ব
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির গুরুত্ব
প্রকাশ ঘোষ বিধান
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বনের গুরুত্ব অপরিসীম। বনভূমিতে গাছ থাকলেই নিরাপদ থাকবে পরিবেশ। অক্সিজেন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবুজ বন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। বন ও বনভূমির রক্ষার্থে ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দিবসটি উদযাপন করা হয় মূলত বন ও জঙ্গলযুক্ত এলাকা রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগণকে বন, বনজ দ্রব্য ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য। তাই সব ধরনের বনের গুরুত্ব ও তা টিকিয়ে রাখতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য।
১৯৭১ সালে ইউরোপীয় কনফেডারেশন অব অ্যাগ্রিকালচারের ২৩তম সাধারণ পরিষদে বিশ্ব বনায়ন দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বন দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দুটি আন্তর্জাতিক স্মারক বিশ্ব বনায়ন দিবস এবং আন্তর্জাতিক বন দিবসকে একত্রিত করে প্রতি বছর ২১ মার্চ দিবসটিকে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।
মানুষের জন্য বৃক্ষ বিশুদ্ধ বাতাস নানা রকম ফল ও উপকরণ সরবরাহ করে। বন শুধু আমাদের অক্সিজেনই সরবরাহ করে না। মানুষ, প্রাণী, পোকামাকড়, বন্য প্রাণীকে আশ্রয় দেয় এবং কার্বনডাই-অক্সাইড শোষণ করে ও আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে, অক্সিজেন সরবরাহ করতে, পর্যটনশিল্প বিকাশে ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বনভূমি। দারিদ্র্য বিমোচনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের মতে, একটি বনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ গাছ থাকে। একজন মানুষের শ্বাস নিতে বছরে ৭৪০ কেজি অক্সিজেন প্রয়োজন। গড়ে একটি গাছ বছরে ১০০ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়। ফলে মানুষের বেঁচে থাকা আর পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার কাজ করছে বনাঞ্চল।
পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ গাছের প্রজাতি পাওয়া যায় বনে। এছাড়া প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষ বনের উপর নির্ভরশীল। তাদের জীবিকা, বস্ত্র এবং ওষুধ সহ মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস গাছের থেকেই পাওয়া যায়। আমাদের দেশজ উৎপাদনে বনজ সম্পদের অবদান ১.৬৬ শতাংশ এবং কৃষিখাতে এর অবদান ১৩.২৪শতাংশ । এছাড়াও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল ঘন গাছে ঘেরা বন অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ঘন বনের গাছগুলি জলকে বিশুদ্ধ রাখে, বায়ু দূষণ মুক্ত করে, জলবায়ু অপরিবর্তিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ডাই অক্সাইড সঞ্চয় করে এবং খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করে। পাশাপাশি বন মানুষকে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান এবং ব্যবসার যোগান দেয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যেখানে কোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে বেশিরভাগ দেশই তা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের বন বিভাগের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী যা ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই হিসাবে বনের বাইরের গাছ আমলে নেয়া হয়নি। কিন্তু বন বিভাগের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বনের বাইরে গাছের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই হিসাবে বনের ভেতর ও বাইরে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির সাড়ে ২২ শতাংশ। এসব গাছের বেশির ভাগই বেড়ে উঠেছে মূলত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে।
উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে তিন ধরণের বনভূমি আছে। ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পত্রপতনশীল বনভূমি; চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে রয়েছে এই বনভূমি। চাপালিস, গর্জন, গামারি, জারুল, কড়ই প্রভৃতি হলো এ বনভূমির প্রধান বৃক্ষ। শালবন; ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের মধুপুরে এ বনভূমি অবস্থিত। এছাড়া রংপুর ও দিনাজপুরেও সামান্য পরিমাণে বনভূমি রয়েছে। এ বনাঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ শাল, এছাড়া ছাতিম, কড়ই ও হিজলও আছে। ম্যানগ্রোভ বনভূমি; বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলায় এই বনভূমি অবস্থিত। সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। এই বনের প্রধান বৃক্ষ হলো সুন্দরী।
আমাদের জীবন ও জীবিকার জন্য বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বৃক্ষের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্বের সম্পর্ক। বৃক্ষ সমস্ত প্রাণীর খাদ্য যোগান দেয়। বিশাল এ প্রাণীজগৎকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন দেয় এবং প্রাণীজগৎকে বিপন্নকারী কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে। বৃক্ষ তার সুবিশাল শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে তপ্ত পৃথিবীকে শীতল করে। বন্যা, ক্ষরা, ঝড় নিয়ন্ত্রণ করে বৃক্ষ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। আবহাওয়া ও জলবায়ুকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে। মাটিকে উর্বর করে তোলে। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া রোধ করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে বৃক্ষ। আমাদের জীবনযাপনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, গৃহনির্মাণে যে বিপুল পরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হয় তা আসে এই বৃক্ষ থেকে। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও জীবন রক্ষাকারী ভেষজ বিভিন্ন ওষুধের মূল্যবান উপাদান আমরা বৃক্ষ থেকে পাই।
মানুষের কুঠারের আঘাতে বন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বৃক্ষ মানুষের এতো উপকারে আসে তারপরও নিধন চলছে। দ্রুত শহরায়ন, শিল্পায়ন, আসবাবপত্র তৈরী, শিল্পের কাঁচা মাল তৈরী, জ্বালানী কাঁঠের সরবরাহ ইত্যাদি অজুহাতে বনাভূমি উজাড় হচ্ছে। এটি মানুষের আত্মঘাতী কর্ম। গাছ কমে যাওয়ায় প্রকৃতির ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে। কার্বন-ডাই-অক্সসাইড, কার্বন-মনো-অক্সসাইড, লিথেন সহ প্রভৃতি ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে বায়ুমন্ডল দূষিত হচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য বনভূমি ও বনজ সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে আমাদের বনভূমি সংকুচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য প্রয়োজনে এই বনভূমি ও বনজসম্পদের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন রোধ করতে হবে। মূল্যবান বৃক্ষসমূহ সরকারি অনুমতি ছাড়া নিধন করা নিষিদ্ধ করতে হবে। আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বৃক্ষরোপণের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপন করে বনাঞ্চল তৈরী করা এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে আমাদেরকে বনভূমির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়েই নয় বরং ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট