শিরোনাম:
পাইকগাছা, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

SW News24
বুধবার ● ২৬ মার্চ ২০২৫
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পরিবেশ রক্ষায় ব্যাঙের ভূমিকা
প্রথম পাতা » মুক্তমত » পরিবেশ রক্ষায় ব্যাঙের ভূমিকা
২৬ বার পঠিত
বুধবার ● ২৬ মার্চ ২০২৫
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

পরিবেশ রক্ষায় ব্যাঙের ভূমিকা

---  পরিবেশ রক্ষায় ব্যাঙের ভূমিকা অপরিসীম। খাদ্যশৃঙ্খলে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং আমাদের পরিবেশের  ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে বিভিন্ন কারণে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাঙ আজ সংকটাপূর্ণ অবস্থায়। এ কারণে ব্যাঙ রক্ষায় প্রতিবছর ২০ মার্চ পালন করা হয় বিশ্ব ব্যাঙ দিবস। ২০১৪ সাল থেকে পালিত হচ্ছে ব্যাঙ দিবস। তবে ঠিক কে বা কোন সংস্থা এই ব্যাঙ দিবস শুরু করেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। এই দিবস তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন ব্যাঙের প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

বর্ষা আসলেই ব্যাঙের ডাকে মুখরিত হয় প্রকৃতি। ব্যাঙ গ্রামবাংলার মানুষের যাপিত জীবন এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষায় বৃষ্টির মেঘমল্লারের সঙ্গে ব্যাঙের বিরামহীন ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কিংবা সন্ধ্যা নামলেই ধানখেতের অল্প পানিতে কোলাব্যাঙের ডাক গ্রামবাংলায় এখনো পরিচিত এক অনুষঙ্গ।

ব্যাঙ বাঙালির সামাজিক জীবন, শিল্পসাহিত্যে, প্রবাদ-প্রবচনে যেমন এসেছে তেমনি নিয়মিতই আসে দৈনন্দিন কথাবার্তায়, উদাহরণ-উপমায়। ব্যাঙের সর্দি, কূপমণ্ডূক, ব্যাঙের ছাতা শব্দবন্ধগুলো অহরহ ব্যবহার করি আমরা। ছোটবেলায় স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হাঁটু মুড়ে বসে দুই হাত হাঁটুর নিচ দিয়ে কান ধরে ব্যাঙের লাফ দিয়েছেন অনেকে।

ব্যাঙ উভচর প্রাণী। জল ও স্থল উভয় ক্ষেত্রেই এদের অবাধ বিচরণ। ব্যাঙের উৎপত্তি প্রায় ২৫৬ মিলিয়ন বছর আগে। বর্ষাকালে প্রজনন ঋতুতে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক সবার পরিচিত। ব্যাঙের জীবনচক্রের কয়েকটি দশার একটি হচ্ছে ব্যাঙাচি দশা। ডিম ফোটার পরপরই আসে এই ব্যাঙাচি দশা। এই দশায় এরা মাছের মতো ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য পরিচালনা করে। এই সময়ে এদের পুচ্ছদেশে লেজ থাকলেও কোনো পা থাকে না। ব্যাঙ প্রজননের পুরো চক্র সম্পন্ন করতে এদের পানিতে থাকতে হয় আর পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় এরা ডাঙায় চলে আসে। এরা দেহের তুলনায় অনেক লম্বা লাভ দিতে পারে। ব্যাঙের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন রকমের পোকা-মাকড়। এক প্রজাতির ব্যাঙ আছে যারা কাঁকড়া খেয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ নানা জায়গায় বসবাস করে। কিছু ব্যাঙ জলে বাস করে।আবার কিছু ব্যাঙ মাটিতে গর্ত করে বাস করে। কিছু ব্যাঙ গাছে আর কিছু ব্যাঙ জঙ্গলে বাস করে। কিছু প্রজাতি নিশাচর, আবার কিছু শীতল রক্তবিশিষ্ট। এরা গায়ের চামড়া ব্যবহার করে শরীরে বাতাস প্রবেশের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। শ্বাসযন্ত্রের কাজ ছাড়াও এদের গায়ের চামড়া পানি শোষণ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও দেহের প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

ব্যাঙ ছোট্ট একটি প্রাণী। কিন্তু মানবজীবনে এই প্রাণির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের জন্য ভূমিকা রাখে এই নিরীহ প্রাণিটি। মশাসহ ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে এই প্রাণিটি ভূমিকা রাখলেও জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করায় এখন হারানোর পথে ব্যাঙ। ফলে গ্রাম-শহর সবখানেই মশাসহ নানান পোকামাকড়ের পরিমাণ বাড়ছে। এতে মানবদেহে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মতো নানান রোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে কৃষকের ক্ষতিও। যা কখনোই কীটনাশক বা ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ব্যাঙ তার এক জীবনে পোকা দমনের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকার বেশি ফসল রক্ষা করে কৃষককে সহযোগিতা করে। সে প্রতিদিন তার দেহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন খাবার খায়। যার ৫০ শতাংশের বেশিই থাকে ক্ষতিকর পোকামাকড়। এরা পরিবেশের অনেক পরিবর্তন আগে থেকেই আঁচ করতে পারে। যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ ড. রাসেল গ্রান্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক প্রকার কুনোব্যাঙ সাধারণত ভূমিকম্পের কমপক্ষে সপ্তাহখানেক আগেই এ ব্যাপারে আঁচ করতে পারে। তখন এরা নিজের ঘর ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।

বিশ্বে ব্যাঙের ৬৩০০ এরও বেশি রেকর্ড সংখ্যক প্রজাতি আছে, যা মোট উভচর প্রজাতির ৮৮ শতাংশ। যার মধ্যে ৪ হাজার ৮০০টি রেকর্ডকৃত ব্যাঙের প্রজাতি অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সারা বিশ্বে পাওয়া গেছে। কিন্তু গত এক দশকে প্রায় ১৭০ প্রজাতির ব্যাঙ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৫০ সালে ব্যাঙের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতি বিপন্ন। ১২০টিরও বেশি প্রজাতি ১৯৮০ সাল থেকে বিলুপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিছু ব্যাঙের বিলুপ্তির কারণ ছত্রাকজনিত রোগ, ব্যাপক হারে আবাসস্থান ধ্বংস, পরিবেশ দূষণ ও কৃষিক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত হারে প্রকৃতি থেকে ব্যাঙ সংগ্রহ এবং মেরে ফেলা প্রভৃতিকে ব্যাঙ বিলুপ্ত হওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু প্রজাতির ব্যাঙ। নষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ২০১৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৯ প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে। সমীক্ষাটির রেড লিস্ট বা লাল তালিকা অনুসারে, এর মধ্যে ১০ প্রজাতির ব্যাঙ বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং আমাদের মত কৃষিভিত্তিক দেশে ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে ব্যাঙ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  পোকামাকড় খেয়ে কৃষি জমিতে কীটনাশকের মত কাজ করে ব্যাঙ, কৃষিক্ষেতের পোকা দমনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। ব্যাঙ আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কাজে সহায়তা করে। ব্যাঙ পোকা-মাকড় খেয়ে ফসলের সুরক্ষা করে, ফলে জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক দিতে হয় না।

ব্যাঙ প্রকৃতির অন্যতম বন্ধু, মানুষের মত ব্যাঙও প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। উভচর প্রাণি ব্যাঙ ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগের বাহককে নাশ করে কৃষক ও মানব স্বাস্থ্যের উপকার করে। কিন্তু অবহেলা আর জ্ঞান স্বল্পতার কারণে আমরা নানাভাবে প্রকৃতির বিনষ্ট করছি। আমাদের অসচেতনতার ফলে ব্যাঙের সংখ্যা দিন দিন হুমকির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাধারণ জনগণের মাঝে প্রকৃতিতে ব্যাঙের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। পরিবেশবন্ধু ব্যাঙের বিলোপ নয় বরং ব্যাঙ রক্ষায় সবাইকে অবদান রাখার প্রত্যয় গ্রহণ করা হোক।





আর্কাইভ

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)